সংখ্যা : ১ম  ২য়  ৪র্থ   5g    7g

   

চতুদর্শ সার্ক সম্মেলন

 
   

শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনে আরো সংহতি আরো ঐক্য


দক্ষিন এশিয়ার শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য আরো সংহতি আরো ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে শেষ হল চতুর্দশ সার্ক শীর্ষ সম্মেলন৷ আট দেশের নেতারাই দক্ষিনি এশিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন৷ তারা সন্ত্রাস দমনের পাশাপাশি এ অঞ্চলকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন৷ গত ৩ এপ্রিল ২০০৭ ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লীর বিজ্ঞান ভবনের কনভেনশন সেন্টারে শুরু হয় সার্ক শীর্ষ সম্মেলন ৷ এবারের সম্মেলনের থিম ছিল Connectivity বা যোগাযোগ স্থাপন৷ অর্থাত্‍ দক্ষিনি এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সংহতি জোরদার করাই এ সম্মেলনের ল্য৷ প্রথমবারের মতো সম্মেলনে যোগ দিয়েছে সার্কের নবীনতম সদস্য আফগানিস্তান৷ গত ৪ এপ্রিল দিল্লী ঘোষণার মধ্য শেষ হয় সার্ক শীর্ষ সম্মেলন ৷ 


দিল্লী সম্মেলন থেকে সার্কভুক্ত দেশগুলো কী পেল?


সার্ক সম্মেলনে ভারতের একক ২টি ঘোষণাকে যুগান্তকারী হিসেবে দেখতে হবে, (১) ভারত সার্কের অনুন্নত দেশ (বাংলাদেশ, নেপাল, মালদ্বীপ ও ভুটান) সমূহের উত্‍পাদিত পণ্যকে এ বছরের শেষ দিক থেকে বিনা শুল্ক ও বিনা অশুল্ক বাধায় প্রবেশের অধিকার দিয়েছে, (২) ভারত সার্কের অন্যান্য দেশসমূহের ছাত্র, সাংবাদিক, রোগী তথা অন্যান্য পেশাজীবীদের ভিসা প্রদানের নিয়ম সহজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে৷ বড় ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিবেশী ছোট রাষ্ট্রগুলোর আস্থা অর্জনের জন্য ভারতের এ ধরণের একক ঘোষণার প্রয়োজন ছিল ৷

সার্ক এর তরফ থেকে ২টি দৃশ্যমান (
Tangible) প্রকল্পের অবতারণা হলো, প্রথমত: সার্ক বিশ্ববিদ্যালয়৷ যদিও এটির কেন্দ্রবিন্দু হবে ভারতে কিন্তু এর ফ্যাকাল্টিগুলো হবে সার্কের অন্যান্য দেশগুলোতে; ভারত শেষ পর্যন্ত এই ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছে৷ পত্রিকায় এ খবরটি আসলেও শীর্ষ সম্মেলনের লিখিত ঘোষণায় এটা এটার কোন ধরণের উল্লেখ নেই, যে কারণে বিষয়টি প্রশ্নবোধকই রয়ে গেল৷ দ্বিতীয়ত: এ অঞ্চলের খাদ্য সার্বভৌমত্ব অর্জনে সার্ক ফুড ব্যাংক স্থাপনের কথা বলা হয়েছে, যা দেশগুলোতে খাদ্য ঘাটতি ও মোকাবেলার ক্ষেত্রে অবদান রাখবে ৷

এর বাইরে ১৪তম শীর্ষ সম্মেলনের ২৯ দফা ঘোষণার মধ্যে উল্লেখযোগ্য যে দফাগুলো আমাদের প্রত্যাশাকে বাড়িযে দিয়েছে, তা হচ্ছে : (৫) প্রতিটি দেশে উন্নয়ন কাজের মডেল হিসেবে একটি করে সার্ক গ্রাম স্থাপন করা, (৬) সার্ক সোশ্যাল চার্টার বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় সমন্বয় কমিটি করা, যেখানে সুশীল সমাজের ভূমিকাকে স্বীকার করা হয়েছে, (৭) প্রতিটি জাতীয় দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচিতে MDG (Millennium Development Goal)  কে সামনে রেখে SDG (Saarc Development Goal) কে অন্তর্ভক্ত  করে ল্যক্ষ নির্ধারণে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে৷ উত্‍পাদনশীল কর্মসংস্থান ও সম্পদে দরিদ্রদের অভিগম্যতাকে গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে৷ (৮) বহুমাত্রিক পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ২০০৭ এর মধ্যে ভারতে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক বসবে ৷ (৯) সার্ক ডেভলপমেন্ট ফান্ডে (SDF) এখন থেকে সার্কভুক্ত দেশ ছাড়াও এর বাইরে থেকে তহবিল নেয়া যাবে৷ সম্মেলনের প্রথম দিকে ভারত বাইরে থেকে তহবিল নেবার বিরোধী ছিল৷ অতি দ্রুত এই তহবিল থেকে প্রকল্প শুরুর জন্য তাগিদ দেয়া হয়েছে৷ (১০) এনার্জি বিষয়ে প্রথম সার্ক মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের তাগিদ দেয়া হয়েছে৷ (১১ ও ১২) ঘোষণায় সার্ক অঞ্চলের পরিবেশ রার জন্য কর্ম পরিকল্পনা বাস্তবায়নের তাগাদা দেয়া হয়েছে৷ ২০০৭ কে দক্ষিনি এশিয়ার 'সবুজায়ন' বছর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে৷ এ অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে এবং এক্ষেত্রে সমন্বিত কর্ম পরিকল্পনা নেয়ার জন্য তারা একটি বিশেষজ্ঞ টিম গঠনে সম্মত হয়েছেন৷ (১৩) সার্ক দেশসমূহ মধ্যেকার টেলিফোন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বিভিন্ন শুল্ক, দাম, হার, ক্রয় ইত্যাদির যৌক্তিকীকরণের কথা স্বীকার করেছেন ৷ ( ১৪) সাফটার ক্ষেত্রে তারা সেবা সেক্টরে এবং বিনিয়োগে উত্‍সাহীকরণ ও সুরায় দ্রুত চুক্তির তাগাদা দিয়েছেন৷ (১৫) কাস্টম প্রথা, ফাইটো সেনিটারি মানদণ্ডগুলোর দ্রুত ও একই ধরণের মান নির্ধারণের তাগাদা দিয়েছে৷ (১৭) দক্ষিনি এশিয়া অর্থনৈতিক ইউনিয়ন ও দক্ষিনি এশিয়া কাস্টম ইউনিয়ন গঠনের একটি রোডম্যাপ তৈরির তাগাদা দিয়েছেন৷ (১৮) সার্ক অঞ্চলের জনগণের ভেতরে আরো বেশি আদান-প্রদানের জন্য বার্ষিক সার্ক উত্‍সবকে প্রতিষ্ঠানীকরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন৷ নেতৃবৃন্দ সার্ক অঞ্চলের নাগরিকদের এ অঞ্চলের পুরার্কীতি সমূহে স্ব-স্ব দেশের নাগরিকদের সমপরিমান ফি নির্ধারণে সম্মত হয়েছেন৷ তারা বাংলাদেশের প্রস্তাবিত প্রথম SAARC Youth Camp প্রস্তাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন৷ (২৫) তারা শ্রীলঙ্কার প্রস্তাবিত আইন বিশেষজ্ঞদের সম্মেলনকে স্বাগত জানিয়েছেন যেখানে ভারতের খসড়াকৃত SAARC Convention on Mutual Asssitance in Criminal Matters  আলোচনা হবে ৷ এটা অনুষ্ঠিত হবে অক্টোবর ২০০৭ এ ভারতে সার্কের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীদের দ্বিতীয় বৈঠকের পূর্বে৷ (২৭) তারা বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার দোহা রাউন্ড আলোচনায় সার্কের সকল বাণিজ্য মন্ত্রীদের তাদের অবস্থান সমন্বিত করার আহ্বান জানিয়েছেন, যেখানে একটি বহুজাতিকভিত্তিক, আইনভিত্তিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, এবং উন্নয়নকে কেন্দ্রবিন্দুতে নেয়া হয়েছে ৷

উপরোক্ত সুনির্দিষ্ট ঘোষণা ছাড়াও তারা উন্নয়ন ও রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণের কথা বলেছেন৷ পুষ্টিহীনতা
দূরীকরণ, দুর্যোগ মোকাবেলা ও জীববৈচিত্র্য সুরা, নারী ও শিশু পাচার প্রতিরোধের কথাও বলেছেন৷ যদিও বিষয়গুলোতে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাবনা বা বাস্তবায়নের সময়সীমা দেয়া হয়নি ৷
 


বাংলাদেশ কী পেল?


১৪তম সার্ক সম্মেলনে বাংলাদেশের ইমেজ বৃদ্ধি পেয়েছে ৷ এটা হয়েছে মূলত দুটো কারণে প্রথমত: সার্ক সম্মেলনের আগে জঙ্গীদের ফাঁসি এবং বর্তমান সরকারের দুনীর্তি দমন বিষয়ক কর্মকান্ডের কারণে, দ্বিতীয়ত: প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দিন সাহেবের সুলিখিত বক্তব্যের কারণে, যেখানে সার্ক অঞ্চলের নাগরিক সমাজের বিভিন্ন দাবি এবং সুদুরপ্রসারী বিষয়সমূহ প্রধান্য পেয়েছে ৷ এর পাশাপাশি অন্য রাষ্ট্র নায়কদের বক্তৃতায় সার্ক অঞ্চলের নাগরিক সমাজের বিষয়গুলো তেমন একটা আসেনি ৷ এবং এটা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে মূলত ড. ফকরুদ্দিনের উল্লেখিত বিষয়গুলোর প্রায় প্রতিটি বিষয়ই সম্মেলনের সমাপনী ঘোষণায় ২৯টি পয়েন্টে জায়গা পেয়েছে ৷

ড. ফকরুদ্দিন তার বক্তৃতায় ছোট ছোট কতগুলো বিষয়ের অবতারণা করেছেন, যা সাথে সাথেই রাষ্টনায়করা গ্রহণ করেছেন ৷ যেমন (১) সার্ক অঞ্চলের দেশসমূহের মধ্যে টেলিফোনের টেরিফ, মূল্যহার সহজ ও সমন্বয় করা যাতে জনগণ সহজে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতে পারে৷ (২) সার্ক অঞ্চলের প্রত্নতাক স্থানসমূহে স্ব স্ব দেশের নাগরিকদের মতো সার্কের অন্য অঞ্চলের নাগরিকদেরও সমপরিমান দর্শনার্থী ফি নির্ধারণ করা ৷ এছাড়া সার্ক যুব উত্‍সবের প্রস্তাবনা খুবই সুদুরপ্রসারী, যা গৃহিত হয়েছে৷ তার বক্তৃতার মধ্যে দিয়ে তিনি
Diplomacy is a art of possibilities কথাটিকেই প্রমান করেছেন ৷

ক্রিকেট পরাজয়ের জ্বরে আক্রান্ত ভারতের প্রধান পত্রিকা
Hindustan Times, The Times of India, The Telegraph, I The Asian Age  এর সার্কের খবর ভেতরের পাতায় স্থান পেয়েছে৷ The Telegraph ৪ এপ্রিল প্রথম পাতায় ড. ফখরুদ্দিনের ছবিসসহ Tagore & Trade Diplomacy শিরোনামে খবর ছেপেছে৷ ড. ফখরুদ্দিন রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার ইংরেজী অনুবাদ দিয়েই তার বক্তব্য শেষ করেছিলেন৷ এপ্রিল ২,৩,৪ ও ৫ তারিখে সব পত্রিকায় এটাই একমাত্র সার্ক সম্পর্কিত প্রথম পাতার খবর৷ The Asian Age এর ৩ এপ্রিল সংখ্যায় Bangla Milestone শিরোনামে সম্পাদকীয়তে জঙ্গীদের ফাঁসি দেবার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা করা হয়েছে৷ সামগ্রিকভাবে সার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশের হয়তো খুব বেশি সুবিধা পাওয়া যাবে না, কিন্তু সম্পর্কের উন্নতিকে কাজে লাগিয়ে ভারত এর তরফ থেকে বাংলাদেশ কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সুবিধা আদায় করে নিতে পারে৷ যেমন (১) ভারতে বাংলাদেশের অবৈধ অভিবাসী যারা ভারতের বিভিন্ন শহরে কাজ করে তাদের জন্য ওয়ার্ক পারমিট প্রদানে অনুরোধ করা৷ ইতিমধ্যে ভারতের ট্রেড ইউনিয়নগুলো এ বিষয়ে দাবী উত্থাপন করেছে৷ (২) সীমান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা, প্রতিদিনকার BDR ও  BSF বন্ধ করা৷ (৩) সমুদ্র পথে Innocent Trespasser ‍ জেলেদের বিনিময়কে সহজ করা৷ বাংলাদেশ সরকারকে ভারতের সাথে সম্পর্কের এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আরো স্থায়ী সুবিধা আদায় করে নেয়া যেতে পারে ৷

সুপ্র মনে করে, 'নয়া দিল্লী ঘোষণা' আমাদের জন্য বিরাট কিছু না হলেও বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটি ও গণমানুষের কিছু দাবি এখানে প্রতিফলিত হয়েছে৷ যেমন, ফুড ব্যাংক,
SDG, সাফটা এবং জলবাযু পরিবর্তন সম্পর্কিত ঘোষণাগুলো৷ গত ফেব্রুয়ারি থেকে সুপ্র এ বিষয়গুলো নিয়ে ক্যাম্পেইন করেছে৷ ৮টি ধারণাপত্র প্রকাশ করেছে৷ একটি আঞ্চলিক জোট হিসেবে সার্কের কাছে আমাদের যা যা প্রত্যাশা ছিল তা হয়তো পুরন হয়নি, কিন্তু দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সার্ক যে তার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে, সামনে এগিয়ে চলেছে -এটাই বড় প্রাপ্তি৷ এরই ধারাবাহিকতায় সার্ক সম্মেলনের এই ঘোষনা সার্ককে নিশ্চয়ই সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে ৷
 

 

© 2007 SUPRO, Bangladesh

 [ send your comments ] [ subscribe ] [ unsubscribe ] [ Send this page to a friend ]

eNewsletter by http://www.supro.org